হোম বাংলাদেশ দিনে হাজার টন বর্জ্য অপসারণের পরও অপরিচ্ছন্ন খুলনা মহানগরী

দিনে হাজার টন বর্জ্য অপসারণের পরও অপরিচ্ছন্ন খুলনা মহানগরী

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
18 ভিউস

মহানগরী থেকে প্রতিদিন এক হাজার টনের বেশি বর্জ্য অপসারণ করেও নগরীকে পরিচ্ছন্ন করতে পারছে না খুলনা সিটি করপোরেশন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, খুলনা মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার টনের বেশি আবর্জনা তৈরি হয়। করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রতিদিন অর্ধশত যানবাহন ব্যবহার করে নগরী থেকে হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম।

বিশিষ্ট এ নাগরিকদের মতে, ড্রেনে ময়লা ফেললে জরিমানাসহ বর্জ্য সাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে খুলনা মহানগরী পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে। সেই সঙ্গে পলিথিন, প্লাস্টিকসহ সব ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এবং খুলনাকে একটি পরিচ্ছন্ন শহর

জামালপুরে এটা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটা পলিফুয়েল নামে পরিচিত। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত হয়েছে ৬৪ জেলায় এই পদ্ধতি কার্যকর
করা হবে।

আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়ালের উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা একমুখী। যেমন কাঁচামাল থেকে পণ্য উৎপাদনের পর আমরা উচ্ছিষ্ট ফেলে দিই। এটা রিসাইক্লিং করা গেলে লাভবান হওয়া যাবে।

তরল বর্জ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) কার্যকর করেছি, যা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে। উৎপাদন শেষে বর্জ্যগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন।

এর ফলে হয়তো উৎপাদন খরচ সামান্য বাড়বে, কিন্তু পরিবেশ ঠিক রাখতে চাইলে ব্যবস্থা নিতেই হবে।
জামিলুর রেজা চৌধুরী

 

তৈরি করতে খুলনা সিটি করপোরেশন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং খুলনার নাগরিকদের যৌথ পরিকল্পনার ভিত্তিতে কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

 

 

 

বিশিষ্টজনরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নানা সংকটে নাগরিকরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সাধারণ নাগরিকদের অসচেতনতা ও গাফলতিও এজন্য অনেকাংশে দায়ী। একদিকে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকটের মুখে পড়েছে।

 

পরিবেশ রক্ষায় সচেতন না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ঢাকা রেখে যাওয়া সম্ভব হবে না। বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে মোট ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিদিন এই শহরে ৬ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন বর্জ্য সৃষ্টি হয়। দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ট্রান্সফার স্টেশন ও ডাস্টবিন থেকে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা। এরপর সেগুলো চূড়ান্ত ডিসপোজাল সাইটে নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ডিসপোজ করা।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গ্রাহকদের কাছ থেকে গৃহকরের ৩ শতাংশ পরিচ্ছন্নতা কর আদায় করে। এটা পরিবহন ও ডিসপোজালের জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ স্থানীয় সমিতিগুলো বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে সিটি করপোরেশনের তিন গুণ টাকা আদায় করে।

 

পথচারীদের জন্য দোকান বা প্রতিষ্ঠানের দরজার পাশে বিন রাখার নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পথচারীসহ সবাইকে সচেতন করা জরুরি।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাস সংগ্রহসহ স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বর্জ্য ডিসপোজালের উপযুক্ত পদ্ধতি বলে মনে হয়।

এটি তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ব্যয়বহুল। জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিং করলে সবটুকু বর্জ্যই ব্যবহার করা সম্ভব।

ঢাকার বর্জে্য বর্ষায় আর্দ্রতা বেশি থাকায় এই পদ্ধতি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত এনার্জি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

ল্যন্ডফিলের জন্য জমি না পেলে ইনসিনারেশন পদ্ধতি বিবেচনায় আসতে পারে। রাস্তার পাশে ট্রান্সফার স্টেশন বন্ধ করা উচিত। প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ ও বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া বন্ধ হতে পারে।

 

 

খুলনা সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আব্দুল আজিজ বলেন, খুলনা সিটি করপোরেশন চেষ্টা করছে নগরীকে পরিচ্ছন্ন করতে। এজন্য প্রতিদিন ৫০টি ডাম্প ট্রাক, স্কেভেটর, ট্রাক, বুলডোজার কাজে লাগানো হচ্ছে। নগরীর রাজবাঁধ এলাকায় ফেলা হয় সব ময়লা। ময়লা ফেলার জন্য আরও কয়েকটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির, নাগরিক নেতা রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ, পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা, সনাক-খুলনার সভাপতি অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু, খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের

 

 

সহকারী পরিচালক মো. হাছান আলী, খুলনা সিটি করপোরেশনের কঞ্জারভেন্সি অফিসার প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান, বেলা খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল সবার মতই একই রকম।

 

বেশি। সে জন্য যারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে, তাদের অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে প্রকল্পের নকশা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও দেখাশোনা করা উচিত।

আমাদের প্রশাসনে পরিবর্তন আনা দরকার। কারণ, বারবার কর্মকর্তার বদলি হওয়ার ফলে অনেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তখন আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়।

শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করলেই হবে না, পানি ও মাটিদূষণ নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের ৩২৮টি পৌরসভা ও ১২টি সিটি করপোরেশন আছে। তার মধ্যে দেখা যায়, মাত্র ৩২টি পৌরসভার নিজস্ব জমি আছে। এ জন্য আমরা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের শহরভিত্তিক কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি।

প্রতিনিয়ত জমির দাম বাড়ছে। তাই সরকারের সহযোগিতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রতিটি পৌরসভার জন্য জমি কেনার চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫টি পৌরসভায় জমি কেনা হয়েছে।

আমাদের শুধু বর্জ্য রিইউজ ও রিসাইক্লিং করতে হবে বলা হয়। অথচ রিকভারির কথা সিস্টেমের কোথাও বলা নেই। থ্রিআর না বলে এখন ফাইভআর রিফিউজ, রিডিউস, রিইউজ, রিপারপাজ ও রিসাইকেল নিয়ে কাজ করার সময় এসেছে।

এ ছাড়া জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যেন তারা কম বর্জ্য তৈরি করে। আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান দিতে হবে। তাই স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

 

তারা বলেন, সাধারণ মানুষ যত্রতত্র ময়লা ফেলছে, নানা ধরনের অপচনশীল বর্জ্য দিয়ে ড্রেন ভরছে এবং পানিপ্রবাহকে বাধা প্রদান করছে।

 

ব্যবস্থাপনার জন্য রাজউক বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ব্যবসায়িকভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন, তাহলে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা খুব সহজ ও লাভজনক হবে।

টাঙ্গাইলের সখীপুরে মাত্র তিন কাঠা জায়গায় বুয়েটের এক ছাত্র একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করেছেন, যেখানে ৫০ হাজার মানুষের মল ও রান্নাঘরের ময়লা একসঙ্গে করে সম্পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে অর্গানিক তৈরি করা হয়েছে।

এটি এখন কৃষিকাজ বা ছাদবাগানে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি সরকার শহর ও গ্রামের মাঝামাঝি এ ধরনের কোনো স্টেশন বসায়, তাহলে অনেক বর্জ্য যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

জামালপুরে তৌফিকুর রহমান ওয়ানটাইম প্লাস্টিককে লোকাল টেকনোলজি দ্বারা উচ্চ তাপে গলিয়ে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন উৎপাদন করছেন।

 

 

বর্জে্যর পরিমাণ কমানো, বর্জে্যর পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিং সম্পদ কনজারভেশনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটা টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে অসংগঠিতভাবে বর্জে্যর পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিং হয়ে আসছে। প্রকৃতপ‌ক্ষে বাংলাদেশে মূল্যবান দ্রব্যাদি বর্জ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে আলাদা করে বিক্রি করা হয়। এক হিসাবমতে ঢাকায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্জ্য সংগ্রহকারী বর্জ্য থেকে প্রতিজন দিনে প্রায় ১৫০ টাকা আয় করেন।

ঢাকা সিটিতে রাস্তায় যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাস ঢাকাবাসীর। ঢাকা সিটিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য প্রধান সড়কগুলোতে ফুটপাতের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছয় হাজার ময়লার বিন স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের এক বছরের মধ্যে এই বিনগুলো হারিয়ে যেতে থাকে।

ঢাকা নগরীতে গণসচেতনতার অভাবে কোনো ভালো চেষ্টা বেশি দিন চালানো যায়নি।

সিটি করপোরেশনের রাস্তার পাশে বর্জ্যের বিন রাখা বন্ধ করতে হবে।

 

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, খুলনায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৩৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুলনা মহানগরী পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে।

 

নগরীর পিটিআই মোড়ের বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, রাতে ময়লা সংগ্রহ না করে দিনের বেলায় সংগ্রহ করতে গিয়ে নাগরিকদের ভোগান্তিতে ফেলছে এবং দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করছে। সর্বোপরি এসব ময়লার গাড়ির বেপরোয়া চলাচল জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ময়লা বহনকারী ট্রাকগুলো ময়লা পরিবহনের সময় ঢেকে না নেওয়ায় শহরের পরিবেশ দূষিত করছে।

 

 

তিনি আরও বলেন, করপোরেশন যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে আগামী এক বছরের মধ্যে পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে খুলনা। তবে তিনি নগরবাসীকে সচেতন হওয়ারও আহ্বান জানান।

 

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন