হোম জাতীয় বেঁচে ফেরা যাত্রীরা দুষছেন লঞ্চের মাস্টার-সারেংকেই

বেঁচে ফেরা যাত্রীরা দুষছেন লঞ্চের মাস্টার-সারেংকেই

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
21 ভিউস

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড ও এর পরের ক্ষয়ক্ষতির জন্য নৌযানটির মাস্টার, সারেং, সুকানিসহ সব স্টাফকেই দুষছেন বেঁচে ফেরা যাত্রীরা। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তারা বলছেন, আগুন লাগার পরও দীর্ঘ সময় লঞ্চটি চালানো হয়। যার পরিণতিতে এত প্রাণ ঝরেছে।

বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ার সময়ই লোক ভর্তি ছিল। চাঁদপুরে থামালে সেখানে থেকে এতো পরিমাণ লোক উঠে যে, তিল ধারণের ঠাঁইও ছিল না। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া এলাকায় সুগন্ধা নদীতে পৌঁছালে রাত সাড়ে ৩টার দিকে লঞ্চের ইঞ্জিন কক্ষে আগুন ধরে যায়। এ সময় কেবিন ও ডেকের বেশিরভাগ যাত্রীরা ঘুমিয়ে ছিলেন।

বেচেঁ যাওয়া যাত্রী বামনা উপজেলার মো. আবদুল্লাহ বলেন, আগুন দেখে নিচতলার ডেকের যাত্রীরা দোতলায় অবস্থান নেন। লঞ্চের স্টাফরা কেবিনের যাত্রীদের বের হতে নিষেধ করেন।

আবদুল্লাহ আরও বলেন, আগুন লাগার পরও লঞ্চটি প্রায় ৩০-৪০ মিনিট চালিয়ে প্রথমে ঝালকাঠির বিষখালী-সুগন্ধা-ধানসিঁড়ি নদীর মোহনায় মোল্লাবাড়ি তোতা শাহর মাজার এলাকায় থামানো হয়। সেখানে লঞ্চের মাস্টারসহ সব স্টাফ নেমে যান। এ সময় কয়েকশ’ যাত্রী নেমে যেতে সক্ষম হন।

ওই লঞ্চের আরেক যাত্রী মো. বাচ্চু মিয়া

বলেন, অনেকে নামতে পারলেও লঞ্চে আটকা পড়েন কেবিন ও ডেকের ঘুমন্ত যাত্রীরা। এখান থেকে লঞ্চটি ভাসতে ভাসতে ঝালকাঠির দিয়াকুল গ্রামে সুগন্ধা নদীর তীরে আটকে যায়। সেখানেও বেশ কিছু যাত্রীকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। অনেকে লঞ্চ থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়েন। ভোর ৫টার দিকে কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ নদীর তীর থেকে যাত্রীদের উদ্ধার শুরু করে।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, উদ্ধার ৩৬ জনের মরদেহের মধ্যে পাঁচজন শনাক্ত হয়েছে। সব মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া লঞ্চের স্টাফদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, ঘটনা তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে মরদেহ দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হবে।

ঝালকাঠির ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া  বলেন, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ৩০টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। বাকি ৯টি মরদেহ কোস্ট গার্ড উদ্ধার করেছে। হেলিকপ্টারযোগে র্যাব, বিআইডব্লিউটিএ, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্ট গার্ডের ডুবুরি দল সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে উপ-পরিচালক কামাল ভূঁইয়া বলেন, তদন্ত ছাড়া এটি পুরোপুরি বলা সম্ভব না। তবে লঞ্চের যাত্রীরা বলছেন, ইঞ্জিনরুমে বিকট শব্দর পর পুরো লঞ্চে আগুন ধরে যায়।

নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চটি পরিদর্শন যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আগুনের পুরো লঞ্চ পুড়ে যাওয়ার পেছনে কোনো রহস্য থাকতে পারে। নয় তো এভাবে দ্বিতীয় ঘটনা আর বাংলাদেশে ঘটেনি। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একজন যুগ্মসচিবকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের হিসাবমতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পুড়ে যাওয়া লঞ্চে ৩৫০ জনের মতো যাত্রী ছিল। এর বেশি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে। এছাড়া লঞ্চের ফিটনেস ঠিক ছিল বলে জানতে পেরেছি। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা এখনই বলতে পারছি না।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেসার্স নেভিগেশন কোম্পানির এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা দিনে ৭৬০ জন। তবে রাতে তা কমে হয় ৪২০ জন। এছাড়া লঞ্চটির লাইসেন্সের মেয়াদও ছিল চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় লঞ্চটি ২৫ জন স্টাফসহ ৩১০ জনের ভয়েস ক্লিয়ারেন্স দিয়ে টার্মিনাল ত্যাগ করে।

 

বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) গভীর রাতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী লঞ্চটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে বরিশাল, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠির কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ শুরু করে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আরও অনেকে। ঘটনাস্থলে হেলিকপ্টারযোগে র্যাব, বিআইডব্লিউটিএ, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এখনো উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

 

যাত্রীদের অভিযোগ, আগুন লাগার পরও ৩০-৪০ মিনিট চালিয়ে নদীর পাড়ে নিয়ে থামান লঞ্চের মাস্টার। কিন্তু যাত্রীদের ঝুঁকিতে ফেলে লঞ্চের মাস্টার, সারেং, সুকানিসহ সব স্টাফ পালিয়ে যান। ওই সময় কয়েকশ’ যাত্রী নামতে পারলেও লঞ্চে থেকে যান ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা।

 

 

অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ যাত্রী রাসেল মিয়া বলেন, আগুন লাগার পর চালক ইচ্ছে করলে লঞ্চটি অনেক আগে থামাতে পারতেন। আগুন লাগার পরও তিনি লঞ্চটি অনেকক্ষণ চালিয়েছেন। পরে নদীর পাড়ে থামিয়ে লঞ্চের সব স্টাফ যাত্রীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে পালিয়ে যান। পরে হুড়োহুড়ি করে কয়েকশ’ মানুষ নামতে পেরেছেন। তবে যারা কেবিনে এবং ঘুমিয়ে ছিলেন তারা নামতে পারেননি। এছাড়া লঞ্চে অক্সিজেন সংকট দেখা দেয়। আমি ডেকে ছিলাম। প্রথমে টের পাইনি। পরে নামার চেষ্টা করেও পারিনি। ভাসতে ভাসতে ভোরে আরেকটা লঞ্চে পাড়ে গিয়ে ঠেকলে তখন স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করেন। আগুনে আমিও কিছুটা দগ্ধ হই।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগুনে শতাধিক যাত্রী দগ্ধ হন। এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। তবে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া জানান ৩৯ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা। দগ্ধ যাত্রীদের উদ্ধার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক শিশু মারা যায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দগ্ধদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদল, ডিআইজি আক্তারুজ্জামানসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।

এদিকে, লঞ্চে আগুনের খবর শুনে যাত্রীদের স্বজনরা ঝালকাঠি লঞ্চঘাট এলাকায় আসেন। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। অনেকে এখনো তাদের স্বজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আবার অনেকে প্রিয়জনকে পেয়েছেন দগ্ধ অবস্থায়।

হারানো স্বজনদের খোঁজে আসা বরগুনার মো. হারুন বলেন, মেয়ে রিমু বেগম (২১), নাতি লিমা (১১) নিখোঁজ আছে। তাদের অপেক্ষায় এখানে আছি।

একই এলাকার আল-আমিন বলেন, আমার বড় ভাই ইদ্রিস (৬০) নিখোঁজ।

ফোরকান বলেন, আমার বোন রিনা (২৮), ভাগনি নুসরাতের (১০) কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

 

 

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন