হোম জাতীয় বিচারপতিরা এখন নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কাজ করছেন: আইনমন্ত্রী

বিচারপতিরা এখন নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কাজ করছেন: আইনমন্ত্রী

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
21 ভিউস

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের ৯৫ জন বিচারপতি বর্তমানে নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক।

 

 

 

সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেওয়া পদক্ষেপকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বলে অভিমত ব্যক্ত করে আইনমন্ত্রী বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপই ছিল নিয়মতান্ত্রিক এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। তার ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল নিশ্ছিদ্র আইনি কাঠামোর ভেতরে।

শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে ফেরার পর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সেগুলিও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান আইনমন্ত্রী।

 

আনিসুল হক বলেন, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান কার্যকর করার পর বঙ্গবন্ধু যেসব পদক্ষেপ নেন তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য পদক্ষেপ ছিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা। এর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর আইনের শাসনের প্রতি ছিল গভীর আস্থা, ছিল পরম শ্রদ্ধা। আর একটি নতুন রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিল তার নিঁখুত ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। সে কারণেই তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক। বঙ্গবন্ধুর ছিল নিয়মতান্ত্রিকভাবে সোনার বাংলা গড়ার পরিষ্কার দর্শন এবং তিনি সেভাবেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠিত করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

 

 

 

 

 

তিনি বলেছেন, ১৯৭২ সালে হাইকোর্ট বিভাগে ১০ জন এবং আপিল বিভাগে ৩ জন বিচারক নিয়ে সীমিত পরিসরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের এ বিশাল অঙ্গের কাজের পরিধি ও বৈচিত্র্যতা যেমন বেড়েছে, তেমনই জনবল ও এজলাসের সংখ্যা বেড়েছে। বিচারকদের সুযোগ-সুবিধা ও স্বাধীনতা বেড়েছে।

শনিবার (১৮ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

 

সুপ্রিম কোর্ট দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে আজ শনিবার আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্টের জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ওই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা সভায় যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিচারকাজ একটা জটিল বিষয়। কিন্তু তারপরও আমি বলব মামলার পরিমাণ দিন দিন যে হারে বাড়ছে, সেটাকে আয়ত্তের মধ্যে আনতে হলে বিচারকদের আরও বেশি কাজ করতে হবে। সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং বিচারকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিচারকদের খেয়াল রাখতে হবে, মামলার রায় হওয়ার পর রায়ের কপি পাওয়ার জন্য বিচারপ্রার্থীদের যেন আদালতের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করতে না হয়।’

তথ্যপ্রযুক্তির সব সুবিধা ব্যবহার করে মামলা ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনতে হবে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য গত বছরের ৯ মে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আইনে পরিণত হয়। করোনাকালে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতের বিচারক ও আইনজীবীরা বিচারপ্রার্থী জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, দেশের সব আদালতের কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে বিচার কার্যক্রমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে অনলাইন ‘কজলিস্ট’ চালু হয়েছে এবং অনলাইন ‘বেল কনফার্মেশন’ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চলছে। সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু ‘কোর্ট অব রেকর্ড’, সেহেতু এর সব নথিকে ডিজিটাল নথিতে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং মামলা দায়ের থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত সব কার্যক্রমকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করাও জরুরি। বিচার বিভাগের আধুনিকায়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং এ লক্ষ্য অর্জনে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বিচার বিভাগকে শামিল হতে হবে। মুজিব শতবর্ষে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। দেশ, জনগণ ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে বিচারকগণ তাঁদের মেধা ও মনন প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন, দেশবাসী তা প্রত্যাশা করে।’

সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘বিচার পাওয়ার অধিকার সকল মানুষের মৌলিক অধিকার।…গতিশীল করার মধ্য দিয়ে বিচার সহজলভ্য করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও সুবিচার নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের সংবিধানের মূল লক্ষ্য। সকলের জন্য বিচারপ্রাপ্তি গতিশীল ও সহজকরণের জন্য আজ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারেরও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।…দেশে অনেক শক্ত আইনি কাঠামো এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারীরা এখনো বিচারবঞ্চিত ও বিভিন্নভাবে নিগৃহীত। তাই আমাদের দেশের নারীরা যাতে তাদের অধিকার আদায়ে পিছিয়ে না থাকেন এবং আইনের আশ্রয় লাভের যে সুযোগ, সেই সুযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো সরিয়ে তাঁরা যেন সুবিচারের জন্য এগিয়ে আসতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিতকরণে আমাদের সকলকে আরও অনেক সংবেদনশীল হতে হবে। একইভাবে দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লিগ্যাল এইড দেওয়ার মাধ্যমে তাদের বিচারের অধিকার সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আমাদের মনোযোগী হতে হবে।’

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বক্তব্য দেন। শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট দিবস উদ্‌যাপনসংক্রান্ত জাজেস কমিটির সভাপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতি, সাবেক বিচারপতি, আইন কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ—রাষ্ট্রের এই তিন অঙ্গের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কই রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য উল্লেখ করে সভাপতির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘বিচারকের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দেশের জনগণও তাঁদের একটি বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।….যেকোনো একজন মানুষের প্রত্যাশা এই যে একজন বিচারক হবেন আইনের জ্ঞানে প্রাজ্ঞ, আদালতের কাজে সময়ানুবর্তী ও নিয়মনিষ্ঠ, প্রশ্নাতীতভাবে ও সকল ক্ষেত্রে সৎ, মানবিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সকলের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও পরিশীলিত আচরণের একজন আদর্শস্থানীয় মানুষ। মানুষের এই প্রত্যাশা কি অযৌক্তিক? নিশ্চয়ই নয়। এটা কেবল বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা নয়। সকল দেশের মানুষই এ রকম গুণাবলির মানুষকেই বিচারক হিসেবে প্রত্যাশা করে। জনমানুষের এই সংগত ও যৌক্তিক প্রত্যাশা পূরণে যত্নবান হতে হবে।’

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘বিচারকদের মনে রাখতে হবে যে একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শক্তির উৎস হলো জনগণ। এটি হলো বিচারকদের সততা, সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি গণমানুষের অবিচল বিশ্বাস।সাধারণ মানুষের এ আস্থা অর্জনের জন্য বিচারকদের একদিকে যেমন উঁচু নৈতিক মূল্যবোধ ও চরিত্রের অধিকারী হতে হবে, তেমনি অন্যদিকে সদা বিকাশমান ও পরিবর্তনশীল আইন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। এটা অর্জন সম্ভব কেবল নিয়মিত অধ্যয়ন এবং সময়মতো ও আইনানুগভাবে বিচারিক কাজ সম্পন্নকরণের মাধ্যমে।’

রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য বিচারক ও আইনজীবী সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচারক একা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।বিচারের সকল পর্যায়ে আদালতের আইনজীবীর সহায়তার প্রয়োজন হয়।…তাই বিচারক ও আইনজীবী উভয়কেই তাদের স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং জ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশে এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট দিবস উদ্‌যাপনের এই ক্ষণে আসুন আমরা সকলে মিলে এ প্রতিজ্ঞা করি—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা পালনে আমরা সদা সর্বদা সচেষ্ট থাকব। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বিচার বিভাগ ভবিষ্যতে মানুষের কল্যাণে আরও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পারবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার পবিত্র পীঠস্থানে পরিণত হবে। বিচারালয়ে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে বিচারপ্রার্থীদের মনে এই আশার সঞ্চার হয় যে তারা এখানে ন্যায়বিচার পাবে।’

 

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বঙ্গভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্মানীয় অতিথির বক্তৃতা করেন।

অন্যান্যের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বক্তৃতা করেন।

 

মন্ত্রী আরও বলেন, দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির, একাত্তরের পরাজিত শক্তি সেই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরের অধ্যায় ছিল সামরিক শাসনের মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নির্বিচারে সংবিধান লঙ্ঘন। এই অধ্যায়ে মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, বিচার পাওয়ার পথই রুদ্ধ করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর একটি মামলা পর্যন্ত রুজু করা হয়নি। বরং খুনিদের যাতে বিচার করা না যায় সেজন্য ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স নামে একটি কালো আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই আইন ২১ বছর এই দেশে বলবৎ ছিল।

 

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন