হোম জাতীয় বাংলাদেশে নারীদের ওপর সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কেমন হয়?

বাংলাদেশে নারীদের ওপর সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কেমন হয়?

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
30 ভিউস

বাংলাদেশে তালাকের পরবর্তী সময়টাতে নানা কারণে নারীদেরকে পুরুষের তুলনায় বেশি ট্রমার মুখে পড়তে হয় বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংসার ভাঙার পুরো দায়টা চাপানোর চেষ্টা করা হয় নারীর ওপর। একদিকে ঘর ভাঙার বেদনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তা নারীদের মধ্যে চরম অনিরাপত্তাবোধ তৈরি করে, বলছেন তারা।

তালাকের বিষয়টিকে নিজের তো বটেই, পরিবারের জন্যও অসম্মানজনক মনে করা হয়।

সেসব কারণে তালাক নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখ খুলতে চান না তারা। পারলে লুকিয়ে রাখা হয় পুরো বিষয়টিকে।

যার কারণে তালাক সমাজে এক ধরণের ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে।
‘তাইলে চিরদিনের লাইগা স্বামী হারা হইলা’

শেরপুরের মিজ নাসিমা একজন পোশাক কর্মী। নাসিমা তার আসল নাম নয়, এখানে পরিচয় গোপন রাখার জন্য নাসিমা নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।

দু’সন্তানের মা মিজ নাসিমার সাথে যখন কথা হয়, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। মাত্র কয়েক মিনিট আগেই অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।

ক্লান্ত থাকলেও বেশ আন্তরিক ভঙ্গিতেই কথা বলতে শুরু করেন মিজ নাসিমা।

তিনি বলেন, ২০০৩ সালে তার স্বামী তাকে তালাক দেন। তবে সেটাও বেশ নাটকীয়তার মধ্য দিয়েই। কারণ এর আগে তিনি চিন্তাই করতে পারেননি যে তার স্বামী তাকে তালাক দিতে পারে।

মিজ নাসিমা বলেন, স্বামীর সাথে কোন কিছু নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না তার। স্বামীসহ বেড়াতে এসেছিলেন বাবার বাড়িতে। সবকিছু চলছিল ঠিকঠাক। তারপর একদিন সকালে হঠাৎ করেই যেন বদলে যায় তার পরিচিত যাপিত জীবন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাসিমা বলতে থাকেন: “সারারাত কাটাইছে আমার সাথে। কাটানোর পরে সকালে যাইবো, যাওয়ার সময় আজানের সময় আমারে বলছে যে, আমারে এই মুহূর্তে ১৬ হাজার টাকা দিতে পারবা?আমি তো বলছি যে আমার মা-বাবা বুড়া হইয়া গেছে, এখন তোমারে কোত্থেকে টাকা দিমু আমি জমিন বেচা ছাড়া?”

এ পর্যন্ত বলে কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিলেন নাসিমা। গলা ধরে আসছিল তার। সেটি লুকাতেই যেন এই বিরতি।

তারপর আবার বলতে শুরু করলেন: “সে কয়, তাইলে চিরদিনের লাইগা স্বামী হারা হইলা।”

“পরে গেল, যাওয়ার পথে রাস্তায় কাজীর অফিসে গিয়া ডিভোর্স দিয়া গেলো, আমরা কেউ জানি না, অনর্থক।”

আঠারো বছর আগের সেই দিনের ঘটনা নাসিমা এমনভাবে বলছিলেন, যেন গতকালই তার চোখের সামনে ঘটেছে এটি।

পুরনো ক্ষতে আঘাত পড়ার মতো বারবারই কান্নায় জড়িয়ে যাচ্ছিল তার কণ্ঠ। আবার বিরতি। থেমে থেমে বলছিলেন নিজের লড়াই আর দুই ছেলেকে বড় করার ঘটনাগুলো।

“যতদিন মা-বাপ আছিল ততদিন ভালভাবেই চলছি, কষ্টের মধ্যেই দিন গেছে, তবুও মা-বাপ আছিল – এতো কষ্ট পাই নাই,” বলছিলেন নাসিমা, “২০০৬ সালে আমার মা-বাপ দুই জনেই মারা গেলো। এরপর মনে করেন …(কান্না) ..অনেক কষ্ট করছি।”

“দুই ছেলেরে ভাইয়ের কাছে রাইখা ‘১০ সালে ঢাকায় চইলা আসছি। গার্মেন্টসে চাকরি নিসি …” শেষ হয় না নাসিমার গল্প। সময়ের হিসাব চলতে থাকে ২০১০ এর পর ২০১১ সাল … আর তার পথচলা।

নাসিমা বলেন, এখন তার দুই ছেলেই বড়। নিজেদের মতো করে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে তারা। আর এতদিন তাদের বাবা কোন খোঁজ না নিলেও এখন মাঝে মাঝে ফোন করেন তিনি।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব বলছে, ২০২০ সালে প্রতি ৩৮ মিনিটে একটি করে বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছে ঢাকা শহরে।
‘আমি ঘুমাতে পারতাম না’

রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় থাকেন মাসুদা লাবনী। সাত তলার সিঁড়ি বেয়ে উঠলে ছাদের একপাশে এক রুমের একটা ফ্ল্যাট। সদর দরজা খুলে ঢুকতেই রান্নাঘর। সাথেই শোবার ঘর।

সেই একটি মাত্র ঘরে ঠাসাঠাসি করে রাখা আসবাবপত্র দেখলেই বোঝা যায়, তার আগের বাসাটি এর চেয়ে অন্তত কয়েক গুণ বড় ছিল। বছর কয়েক আগে স্বামীর সাথে তালাক হওয়ার পর এটিই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।

মিজ লাবনী জানান, ১০-বছরের সংসার ভেঙে যাওয়াটাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারতেন না তিনি।

“আমার মধ্যে মেন্টাল একটা ট্রমা সবচেয়ে বেশি যেটা কাজ করতো যে, সেটা হচ্ছে বিশ্বাস … যে একটা মানুষের সাথে আমি ১০ বছর কাটালাম সে কীভাবে আমাকে ডিভোর্স দিতে পারে সেটা আমি ক্লিয়ার হতে পারছিলাম না,” বলছিলেন তিনি।

তালাকের পরবর্তী সময়টার কথা বলতে গিয়ে এখনো শিউরে ওঠেন তিনি। সেসময় তার অবস্থার কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে মিজ লাবনী বলেন, “সবাই আমাকে দেখলে ভাবতো যে আমি মনে হয় স্বাভাবিক না, আমি নিজেও বুঝতাম যে, আমি স্বাভাবিক না।”

“ট্রমাটা আমার ভেতর এক-দেড় বছর প্রবলভাবে ছিল। আমি ঘুমাতে পারতাম না। না ঘুমিয়ে অফিস করতাম।”

মিজ লাবনী বলেন, তালাকের পর প্রথমদিকে তার নিজের পরিবারের সদস্যরাও মনে করতো যে, সব দোষ তার। বছর দেড়েক সময় পার হয়ে যাওয়ার পর তারা কিছুটা বুঝতে শুরু করে।

কথা বলতে বলতে লাবনী জানান, এখন মানসিক যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছেন।
‘প্রাথমিক ধাক্কা কাটাতে ছয় মাস’

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালাকের পর সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ নানা কারণে ট্রমা বা প্রবল মানসিক আঘাতের মুখে পড়েন নারীরা।

একদিকে তার সংসার ভাঙায় একটা ব্যর্থতার মনোভাব যেমন কাজ করে, আত্মবিশ্বাস কমে যায়, অন্যদিকে তার মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করে।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, তালাকের পর যে মানসিক ট্রমা তৈরি হয় সেটা থেকে বের হতে অনেকের দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

এটা অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে ওই ব্যক্তি মানসিকভাবে কতটা দৃঢ় তার উপর।

“আগের সংসারটা যে সে লস করলো, এই লস ইভেন্টটা সে ছয় মাসের মধ্যে কাটিয়ে উঠে। কিন্তু এই পেইনের যে আরো কিছু ধরণের নতুন নতুন কনসিকুয়েন্স তৈরি হয় সেটাকে তার নতুন করে ফেইস করতে হয়,” বলছিলেন তিনি।

“তার সামনের লাইফটা কিভাবে চলবে সেটা নিয়ে একটা অনিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। নতুন নতুন মানসিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে না পারলে তার থেকে আরো সমস্যা তৈরি হয়।”

মিজ সরকার বলেন, এটা নির্ভর করে যে তার আশপাশের মানুষ তাকে কতখানি সাপোর্ট দিচ্ছে এবং সে কতখানি হ্যান্ডেল করতে পারছে। অনেক সময় অনেক নারী সেটা কাটিয়ে উঠার জন্য মানসিকভাবে সক্ষম নাও থাকতে পারে।
‘প্রতিদিন ১০০ টাকার কাজ’

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, তালাকের শুধু মানসিক নয়, অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের তালাকের পর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। এমনই একজন সিরাজগঞ্জের সাবিনা।

এটিও তার আসল নাম নয় এবং পরিচয় গোপন রাখার জন্য এখানেও তার নামটি পরিবর্তন করা হয়েছে।

দু’হাজার চৌদ্দ সালে তালাক হয় তার।

মিজ সাবিনা জানান, সামাজিক আর অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল তার শ্বশুড়বাড়ির লোকজন।

তবে তালাকের পর নিজের আর দুই সন্তানের ভরণ-পোষণ নিয়ে যেন অথৈ সাগরে পড়তে হয়েছিল তাকে।

এমন অবস্থায় খরচ যোগাতে শুরু করেন দর্জির কাজ। ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটান আর্থিক অবস্থার।

মিজ সাবিনা বলেন, “আমার আগে থেকেই ড্রেস মেকিংয়ের কাজ জানা ছিল … মানে লেডিস টেইলার্স। এটা বাসায় আবার শুরু করি। এই লেডিস টেইলার্সের ওপরেই আমাদের জীবিকা নির্বাহ শুরু হয় প্রথম থেকে।”

তবে শুরুর লড়াইটা খুব সহজ ছিল না মিজ সাবিনার জন্য। নিত্যদিনকার আহার যোগানোটাই তখন মুখ্য ছিল তার।

“প্রতিদিন আমার টার্গেট ছিল যে ১০০ টাকার কাজ হলেও অন্তত আমরা তিন জন খাইতে পারবো। ধীরে ধীরে আমার কাজ বাড়তে থাকে।”

“আমার শুধু এই সেলাই মেশিনের ওপরেই আমার দুই ছেলেকে মানুষ করেছি আমি,” বলেন তিনি।
‘অলিখিত স্বামী’

তবে বিয়ে এবং তালাকের পর যাদের সন্তান থাকে এবং পরিবারের অন্য কোন সহায়তা থাকে না, সেই একাকী মা বা সিঙ্গেল মাদারদের লড়াইটা হয় আরো কঠিন।

তেমন একজন সৈয়দা জিনিয়া মোমেন।

রাজধানী ঢাকার কাওরানবাজার এলাকায় সাত তলার একটি ফ্ল্যাটে মেয়েকে নিয়ে একাই থাকেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষার পর বিদেশি একটি সংস্থায় চাকরি করতেন।

এর পর ২০১২ সালে বিয়ে হয় তার। মাত্র দু’বছর যেতে না যেতেই স্বামীর সাথে তালাক হয়।

দশ-মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে বাবার বাসায় থাকতে শুরু করেন তিনি। মেয়ের দেখাশুনার জন্য ছেড়ে দিতে হয় আন্তর্জাতিক সংস্থার চাকরীটিও।

একই বছরে বাবার মৃত্যু হলে, ছোট ভাই আর মেয়েকে নিয়ে একেবারেই একা হয়ে পড়েন তিনি। কাছের আত্মীয়রাও দূরে সরে যায়।

কারণ তালাকের দায়টা নারীর ওপর চাপানোর প্রবণতা রয়েছে এবং একে ওই নারী ও তার পরিবারের প্রতি অসম্মানজনকভাবেই দেখা হয়।

এছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ থাকে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। কারণ সামাজিকভাবে লিঙ্গগত দিক থেকে পুরুষের তুলনায় নারীদেরকে কম ক্ষমতাসম্পন্ন ভাবার প্রবণতা রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন, এসব এসব কারণেই পুরুষ আর নারীর ওপর তালাকের প্রভাব ভিন্ন হয়।

তিনি বলেন, “আমি মনে করি সারা পৃথিবী জুড়েই তালাকের প্রভাব পুরুষের তুলনায় নারীদের ওপর বেশি পড়ে। কারণ আমরা মনে করি যে তারা নির্ভরশীল।”

“অর্থনীতিতে ফেমিনাইজেশন অব পোভার্টি বলে একটা কনসেপ্ট আছে। নারীরা হচ্ছে দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম। যদি তারা অর্থনৈতিকভাবে এবং সামাজিকভাবে প্রভাবশালী না হন তাহলে পুরুষের তুলনায় তাদের উপর তালাকের প্রভাব নেতিবাচক হয়।”

তিনি বলেন, নারীদের মানসিক অবস্থা সমাজ বোঝার চেষ্টা করে না। তালাকের ক্ষেত্রে নারীদেরকেই বেশি দোষারোপ করা হয়।
‘নারীরা অধিকার সচেতন নন’

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, নারী কিংবা পুরুষ যে কেউই তালাকের আবেদন করতে পারে।

তবে বেশিরভাগ নারীই তাদের আইনগত অধিকার নিয়ে খুব একটা সচেতন নয় বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ভুল ধারণা রয়েছে দেনমোহর পরিশোধ নিয়েও।

 

অভিযোগের স্বরে মিজ মোমেন বলেন, স্বামী না থাকার কারণে কটূক্তি, বাজে ইঙ্গিতসহ নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।

“যখনই সামাজিকভাবে প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, মেয়েটা সিঙ্গেল উইমেন বা সিঙ্গেল মাদার, তার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে বা মারা গেছে, সমাজের বেশিরভাগ পুরুষেরই মনে হয় যে, ওই মেয়েটাকে তারা ওউন (মালিকানা) করছে। মানে, অলিখিত একটা স্বামী কেন জানি সবাই হতে চায়,” জানালেন তিনি।

মিজ মোমেন বলেন, তালাকের পর বেশ কয়েক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও একা থাকার কারণে স্বজনদের কাছ থেকেই শুনতে হয় নানা প্রশ্ন।

তার একা থাকার বিষয়টিতে অনেকেই ভালভাবে নিতে পারেন না।

তিনি বলেন, “এটাও যেন সমাজের কাছে একটা প্রবলেম যে আমাকে একটা বিয়ে করাই লাগবে।”

মিজ মোমেন বলেন, তিনি না চাইলেও তার পরিবারের সদস্যরা তালাকের বিষয়টি গোপনই রাখতে চান।

এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে যে তার স্বামী কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে তালাকের বিষয়টি লুকিয়ে তার স্বজনেরা জানান, “তার স্বামী বিদেশে থাকেন।”

এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, তালাক বিষয়টি একটি সামাজিক ট্যাবুর মতো কাজ করে।

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন