হোম জাতীয় জীবন বিপন্ন করে উন্নয়নের মূল্য নেই

জীবন বিপন্ন করে উন্নয়নের মূল্য নেই

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
36 ভিউস

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশবাদী আইনজীবী এবং প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)। বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ‘পরিবেশ পুরস্কার’ এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ’ অর্জনকারী। ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনে ‘হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট’ এবং ২০১২ সালে ফিলিপাইনের প্রখ্যাত ‘রামোন ম্যাগসেসে’ পুরস্কারও লাভ করেন।

সম্প্রতি কক্সবাজারে বনের মধ্যে জনপ্রশাসন বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিয়ে কথা বলেছেন সঙ্গে। দীর্ঘ আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে পরিবেশ ও উন্নয়নের নানা প্রসঙ্গও। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

আমি এটি অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। প্রশাসন অনেক আগে থেকেই অনেক বিষয়ে রাজনীতিকদের বিতর্কিত করে ফেলছে। প্রভাব তো ফেলছেই।

আমার ধারণা, এ বিষয়ে রাজনীতিকরা হয়তো সব জানেন না। কিন্তু বন কাটলে, পাহাড় কাটলে কী পরিমাণ আন্দোলন হবে তা হয়তো প্রশাসন বুঝতে পারছে না। শেষে কিন্তু মন্ত্রী-এমপিকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

আবার বিষয়টি এমনও হতে পারে যে, প্রশাসনের বিপক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত রাজনীতিকরা নিতেও চাইছেন না। প্রশাসনকে পক্ষে রাখাও জরুরি। কিন্তু দেশের আইন তো আছে। আইনের বাইরে তো কেউ নয়।

জনআন্দোলনকে কোনো না কোনোদিন গুরুত্ব দিতেই হবে। আপনি শতজন মানুষকে বলেন যে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না। আপনার এই কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সরকারি দলের কেউ কেউ পক্ষে অবস্থান নিলেও শতকরা ৯০ জনই বলবে আমরা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না।

এখন একটা গণতান্ত্রিক সরকার যদি বলে জনমতে আমার কিছু যায় আসে না, আমি জনমত দমন করেই প্রকল্প করবো, করতে পারছেও হয়তো। কিন্তু তাতে কি সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে? আমি বলবো, না। রামপালে সাধারণ মানুষ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চায় না। মানুষ প্রতিবাদ জারি রেখেছে।

 

পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় সাধারণ মানুষ যেগুলো করে এগুলো কিন্তু সিস্টেম করাপশন (ব্যবস্থাপনাগত দুর্নীতি) না। এগুলো অভ্যাসের বিষয়। আপনার দেশে সিস্টেম যদি উন্নত হয়, সাধারণ মানুষগুলোর অভ্যাসও ধীরে ধীরে উন্নত হয়ে আসবে। সিস্টেমই যেখানে ইনএফিশিয়েন্ট (অকার্যকর), সিস্টেমই যেখানে রেসপন্সিভ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষের ওপর দায় চাপাতে পারি না

এটাকে আপনি শক্তি কেন বলছেন? আমি তো সেটাকে শক্তি বলবো যেটা জনগণের কাছ থেকে আসে। শক্তি তো সেটা, যা আইন-সংবিধান সংরক্ষণ করে।

আইনের বিপক্ষে গিয়ে প্রশাসন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তা কোনোভাবেই শক্তি হতে পারে না। আমি বলছি না, প্রশাসনে সৎ, ভালো মানুষ নেই। কিন্তু যারা প্রভাব রাখছে, তারা জনদায় থেকে রাখছে না।

আমি মনে করি, সরকার, প্রশাসন আইনের মধ্যে থেকে উন্নয়ন করুক। সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে দেড়শ’ গাছ কাটা নিয়ে কী আন্দোলন হলো। আর গোটা একটি বন উজাড় করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করলে তা অবশ্যই জনগণ মেনে নেবে না। সরকার বারবার ঝুঁকি নেবেই বা কেন? প্রশাসনের অনেকে জানেই না।

 

আমাকে যারপরনাই অবাক করেছে এই প্রক্রিয়াটা। বনকে বনের বিরুদ্ধে যেন ব্যবহার করা না হয় সেজন্য কিন্তু ২০১৯ সালে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই মামলা করার পরই আমরা ওই ঘটনাটা জানতে পেরেছি। তখন আমরা আদালতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পার্টি (পক্ষভুক্ত) করার জন্য আবেদন দিয়েছি। প্রথমে তো তারা (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) পার্টি ছিল না। তার মানে আদালতের নিষেধাজ্ঞা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওপরও কিন্তু প্রযোজ্য। তারপরও তারা কী করে এ প্রস্তাব পাঠালো এটা আমার একেবারেই বোধগম্য হচ্ছে না। অবশ্যই যদি দেখি যে আমাদের সাধারণ চিঠিতে, আমাদের উদ্বেগের চিঠিতে, অন্য ক্যাম্পেইনে আমাদের কথা তারা শুনছেন না, তখন অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়া নেবো।

 

দেখেন, ঢাকা তো আসলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ঢাকা আমার প্রাণপ্রিয় শহর। ঢাকার ফুচকা যত মজা, পৃথিবীর আর কোথাও ফুচকা তত মজা নয়। আমার প্রাণপ্রিয় শহর বলেই তো আমি একে বাঁচাবো। আপনার ছেলে যখন পরীক্ষায় খারাপ করে আপনি তাকেই বকেন। পাশের বাসার ছেলে পরীক্ষায় খারাপ করলে আপনি গিয়ে তাকে বকে আসেন?

কেন আমরা ঢাকার পরিবেশ, প্রশাসন এবং ঢাকার উন্নয়নের মডেলের সমালোচনা করি? কারণ এটা আমাদের প্রাণের শহর। যে পরিমাণ যানজট-ধূলিজটের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি, এই বেঁচে থাকাটাও তো একটা বিস্ময় যে, এই পরিমাণ দূষণের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। উন্নয়ন করতে কি পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না? রাষ্ট্রের কর্তারা কি ব্যাংককে যাননি, সিঙ্গাপুরে যাননি, মালয়েশিয়া যাননি? সেখানেও তো উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কি মানুষজনকে ধূলিকণার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে?

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য নগরী। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলি, আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপের ওপর বসে থাকো কেন? তুমি নিজে বোঝো না? তুমি ঢাকায় থাকো, তুমি নিজে দেখো না আমরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করছি?

অবশ্যই। কিন্তু জীবন বিপন্ন করে উন্নয়নের মূল্য নেই। মূলত একটা দর্শন লাগবে যে, ঢাকাকে আমি কেমন দেখতে চাই ২০৩০-এ, ২০৪০-এ এবং ২০৫০-এ। ঢাকা শহর কোনো রকম দর্শন ছাড়াই চলছে। যখনই যে ক্ষমতায় আসছে সে তার মতো করে সাজিয়েছে।

একজন মেয়র এক ধরনের উন্নয়নের মডেল দেবে আপনাকে, তো অন্য মেয়র এসে আরেক ধরনের মডেল দেবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটা ভিশন ডিফাইন (লক্ষ্যমাত্রা ঠিক) করতে হবে। সেই ভিশনে ঢাকায় তো উন্নয়ন কখনোই হয়নি, হচ্ছেও না, অদূর ভবিষ্যতে হবে এ রকমও আমি দেখতে পাচ্ছি না। ঢাকা শহরের মানুষ সাফার করছে। কন্ট্রাক্টর যেভাবে ফ্লাইওভার বানাবে ফ্লাইওভার সেভাবেই হবে, এটাতো আসলে হতে পারে না। সরকার কেন যেন এই জায়গাগুলোতে জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজনও বোধ করে না। জনভোগান্তি কমানোর জন্য উদ্যোগও নেয় না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা সরকারের ব্যর্থতা।

অবশ্যই। এই দেশে সাধারণ গরিব মানুষ যেখানে সেখানে থুথু ফেলে। তবে তারা বন দখল করে না, নদী দখল করে না, নদী দূষণ করে না। কারণ, তারা ইন্ডাস্ট্রির মালিক নয়। কৃষক কৃষি জমির উর্বরতা কখনো নষ্ট করতে চায় না।

সাধারণ মানুষের ওপর দয়া করে দায়টা চাপাবেন না। পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টায় সাধারণ মানুষ যেগুলো করে এগুলো কিন্তু সিস্টেম করাপশন (ব্যবস্থাপনাগত দুর্নীতি) না। এগুলো অভ্যাসের বিষয়। আপনার দেশে সিস্টেম যদি উন্নত হয়, সাধারণ মানুষগুলোর অভ্যাসও ধীরে ধীরে উন্নত হয়ে আসবে। সিস্টেমই যেখানে ইনএফিশিয়েন্ট (অকার্যকর), সিস্টেমই যেখানে রেসপন্সিভ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষের ওপর দায় চাপাতে পারি না। আমাকে তো কেউ ঠিকমতো কাজটা করতে শেখায়ইনি কখনো। নেতৃত্বের কাজটা হচ্ছে আমাকে শেখানো। নেতৃত্ব আমাকে শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন