হোম জাতীয় ‘গরু শিথানে নিয়া হুতি, চোরে নিলে আগে আমারে নেওয়া লাগবো’

‘গরু শিথানে নিয়া হুতি, চোরে নিলে আগে আমারে নেওয়া লাগবো’

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
24 ভিউস

‘গত বছর রাত ১১টার দিকে গরু দেখে শুতে গেছি। ১২টার দিকে উইঠা দেহি (দেখি) গরু নাই। দুইডা গরু আছিল, দুইডা একসাথে নিছে। একটা গাভী, একটা হার (ষাঁড়)। অহনো গরু পালতাছি। কিন্তু আমি যেহা রুমে থাহি (থাকি) সেহানে (সেখানে) শিথানে নিয়া হুতি (মাথার কাছে নিয়ে থাকি)। এই ছাড়া আর কোনো পথ নাই। নিলে আমারে নেওয়া লাগবো আগে, পরে গরু। অহন গরু একটাই আছে। হার (ষাঁড়) গরু।’

কথাগুলো আক্ষেপ করে বলছিলেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার রাওনা ইউনিয়নের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আব্দুল গফুর। এক বছর আগে দুই গরু হারিয়ে ৬০ হাজার টাকার বেশি লোকসান গুনেছেন। এখন বাধ্য হচ্ছেন গরুর সঙ্গে একঘরে থাকতে।

পঁচুয়া জব্বারনগর মোড়ে তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে জড়ো হয়ে গেলেন কয়েকজন। এর মধ্যে চার-পাঁচজনের কাছে গরুর চুরির অভিযোগ পাওয়া গেলো। রাওনা ইউনিয়নের আরও কয়েকজন জানালেন এ বিষয়ে। রাওনা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মো. বাবুলও বললেন গরু চুরি নিয়ে উদ্বেগের কথা।

একসময় গফরগাঁও মানে ছিল ডাকাত আতঙ্ক। সন্ধ্যার পর অন্ধকার সড়ক কিংবা রাত-বিরাতে যে কোনো বাহন নিয়ে মানুষ বাইরে বের হতে ভয় পেতো। সেই আতঙ্ক এখন অনেকটা কম। তবে স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে এখন সবার কাছে এলাকার প্রধান সমস্যা গরু চুরি। বিশেষ করে যাদের বাড়ি রাস্তার পাশে তারা বেশি আতঙ্কে থাকেন। চলতি মাসেও দুটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত নয়-দশদিন আগে চুরি হয়েছে এক আওয়ামী লীগ নেতার তিনটি গরু। পুলিশ চলতি মাসে দুটি গরু চুরির ঘটনা স্বীকার করলেও জনগণেরও দায় আছে বলে মনে করে। তবে চুরি রোধে তারা টহল জোরদার করেছে বলেও জানায়।

সোমবার (১৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ভাষাসৈনিক আব্দুল জব্বার জাদুঘর থেকে বেরিয়ে চুলের কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়া নারীদের সঙ্গে কথোপকথনে বেরিয়ে আসে বিষয়টি। চুলের কারিগর রুমার দুটি গরু। বসতঘরের সঙ্গে লাগোয়া গোয়ালঘরে দেখা গেলো তালা দেওয়া। তিনি জানালেন, সারারাত চৌকি দিতে হয়, ঘুম হয় না ঠিকঠাক।

রুমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে জব্বারনগর মোড়ের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে পরিচয় মেম্বার মো. বাবুলের সঙ্গে। উপজেলাজুড়ে গরু চুরির আতঙ্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই এলাকায় গরু চুরি হয়, বলতে পারেন এলাকায় একটাই সমস্যা—গরু চুরি। গরু চোর ধরা পড়লেও দুদিন পর জামিন পেয়ে যায়। চোর এলাকারও আছে, এলাকার বাইরেও আছে। প্রশাসন বলে আপনারাও ধরেন। খবর পেলে আসে। কদিন আগে বারুল প্রাইমারি স্কুলের ওখানে দুটো গরু চুরি হয়েছে। একজনরে ধরে চেয়ারম্যান মেরে রক্তাক্ত করেছে। তাও কমে না। কয়েকদিন আগে এক ট্রাক গরু চুরি করে নেওয়ার সময় চোরের দল ধরা পড়ে। একটা-দুইডা না, বহুত গরু চুরি হইছে। অন্য এলাকায় হলেও আমাদের এখানে বেশি। একটা মানুষ ঠিকঠাক ঘুমাতে পারে না।’

আরেক ভুক্তভোগী বেলাল পাশ থেকে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, দুই-একটা গরু রাখি। কিন্তু চোরের ডরে অহন (এখন) গরু রাখতে পারি না। ছিল দুইডা বিক্রি কইরা হেলছি (ফেলছি)। কয়েকদিন কইরা গরু নিতে আইছে। সাড়া শব্দ পাইয়া উঠলেই পালাই যায়। হজাগ (সজাগ) থাহি (থাকি)। তালা লাগাইলেও কাইটা নিয়া যায় গা। করোনার মইদ্যে এটা বেশি হইছে।’

.

কথার রেশ না কাটতেই হাজির হলেন মো. অলিউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘গত বছর কোরবানি ঈদের ১৮ দিন আগে আমার দুইডা গরু চুরি হইছে। দুইডা হার (ষাঁড়)। তালা মারা আছিল। ছয়শ টাহার তালা কাটছে। জবইর হার (জবাই করার উপযোগী ষাঁড়)। দুটো কিনছিলাম ৭০ হাজার ট্যাহা দিয়া। কোরবানি ফেরত। ছোট আছিল, দাতিনা। পরের কোরবানি ঈদে এক লাখ ২০ হাজার ট্যাহা দাম উঠছিল। আমার বহু ট্যাহা এর পেছনে ইনভেস্ট গেছে। রাত ১টার দিকে গরুর গোবর পরিষ্কার কইরা শুইছি। বাড়িওয়ালি ভোরে দেহে (দেখে) তালা পড়ে আছে, গরু নেই। থানায় জানাইছি। আমার বাড়ি যশোরা (ইউনিয়ন)।’

‘কাশেম মেম্বার, দুলাল মিয়া, একজন আওয়ামী লীগ নেতারও চুরি হইছে। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে ক্ষ্যামা দিছি। আমাদের গফরগাঁওয়ে গত কয়েকবছর যে কত গরু চুরি হইছে হিসাব নেই। অহন শুধু হার গরু না, গাভীও নিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী নেতা ফখরুলের গরু নিছে তিনডা। এলাকার মানুষ ঘুমাতে পারে না। একটা গরু গরিবের নিলে তার তো গরুডাই সম্বল। প্রশাসন ধরলেও ছাড়া পাইয়া যায়। দুইডা বছর বেশি বাড়ছে। চেয়ারম্যান-মেম্বারও কিছু করতে পারে না। তবে চেষ্টা করলে তারা পারবে।’

গরু চুরির পর জবাই করে মাংস কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান মেম্বার বাবুল।

এ বিষয়ে কথা বলতে রাওনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুল আলমের সঙ্গে কথা বলতে কয়েক দফায় ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ বলেন, ‘গরু চুরি বেড়েছে সেটা না, গরু চুরি তো হয়ই। এলাকার চিহ্নিত যারা চোর তাদের আমরা ধরেছি। এই চোররা বিভিন্ন এলাকার। সেদিন সিরাজগঞ্জ থেকে একটা দল এসেছিল, ভালুকাও নেমেছিল। তাদের আমরা ধাওয়া করি। বিভিন্ন পয়েন্টে আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি, ডিউটি বাড়িয়েছি। বিশেষ করে যেসব পয়েন্ট দিয়ে চোরেরা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এসব এলাকায় গিয়েছি। তাদেরও সমস্যা আছে। গরু ছেড়ে দিয়ে রাখে। ছেড়ে রাখলে চুরি তো হবেই। যখন চুরি হয় তখন অভিযোগ দেয়। কেউ আবার বলে আমাদের এখানে চুরি হয় না। আমরা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও চৌকিদারদের নিয়ে পাহারা জোরদার করেছি। হোসেনপুর টহল বাড়িয়েছি। আমি এক মাসে দুটো কেস পেয়েছি। গরু কাভার্ড ভ্যানে চুরি করে। এজন্য আমরা রাতে চেকপোস্ট বসিয়ে কাভার্ড ভ্যানগুলো চেক করি। মনে হয় না এখন আর এমন ঘটনা ঘটবে।’

তবে গরু ছেড়ে দিয়ে না রাখার অনুরোধ জানান ওসি।

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন