হোম ইসলাম শাসনক্ষমতার পরিক্রমা

শাসনক্ষমতার পরিক্রমা

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
4 ভিউস

সৃষ্টির আদি থেকে অদ্যাবধি শাসনক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সদা বিরাজমান। সুষ্ঠু সমাজ, আদর্শ, উন্নত ও সুশৃঙ্খল দেশ গঠনে এটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ ব্যাপারে দায়িত্বসচেতনতা, আত্মসংযম ও সতর্কতার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।

সব ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহর অসংখ্য গুণবাচক নাম বর্ণনার মধ্যমে তার পরিচিতি, শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, মাহাত্ম্য, কর্তৃত্ব ও বিশেষত্ব প্রমাণিত ও প্রকাশিত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারবে না; কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তার সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বপেক্ষা মহান।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৫৫)

আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন। তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা। তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক, পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপান্বিত, মাহাত্ম্যশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নামসমূহ তাঁরই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ২২-২৪)

মানুষ আল্লাহ তাআলার নগণ্য এক সৃষ্টি। তবে সৃষ্টিকুলের মাঝে সবার থেকে আলাদা ও অনন্য। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও সম্মান দান করেছেন এবং সুন্দর অবয়ব-আকৃতি দিয়ে জগতের সব কিছুকে তাদের কল্যাণেই নিয়োজিত রেখেছেন। মহান আল্লাহ মানুষের প্রকৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘আল্লাহ, তিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন এবং দুর্বলতার পর শক্তি দান করেন। অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা আর-রুম, আয়াত : ৫৪)

যেহেতু পার্থিব এ জীবন ক্ষণস্থায়ী, তাই এ জীবনের অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বিত্ত-বৈভব, শাসনক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্ব; সবই স্বল্পমেয়াদি এবং অসাড়। পার্থিব এ জীবনের মোহে পড়ে মানুষ অনেক সময় আল্লাহকে ভুলে যায়। জাগতিক উপায়-উপকরণ ও মাধ্যমকে সব সমস্যার সমাধান মেনে ‘ধরাকে সরা জ্ঞান করে’। তারা একদমই ভুলে যায়—আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ-ই কোনো কিছু করার সক্ষমতা রাখে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে লোক সকল, একটি উপমা বর্ণনা করা হলো। অতএব, তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা করো, তারা কখনো একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। যদিও তারা সবাই একত্র হয়, আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৭৩)

মানুষ সৃষ্টির প্রথম থেকে এ পর্যন্ত অনেক ক্ষমতাধর, প্রতাপশালী, অত্যাচারী ও অহংকারী অসংখ্য রাজা-বাদশা ও শাসকের দেখা পেয়েছে পৃথিবী। কিন্তু কারো শাসনক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি এখানে স্থায়িত্ব পায়নি। একদিন দুনিয়ার চিরাচরিত নিয়মে কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে তারা, তাদের সব খ্যাতি ও অর্জন। তাদের ভয়াবহ ও করুণ পরিণতির কথা পবিত্র কোরআনে বেশ কয়েক স্থানে বর্ণিত হয়েছে। চরম অত্যাচারী ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারী শাসক নমরুদ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি সে লোককে দেখনি, যে পালনকর্তার ব্যাপারে বাদানুবাদ করেছিল ইবরাহিমের সঙ্গে এ কারণে যে আল্লাহ সে ব্যক্তিকে রাজ্য দান করেছিলেন? ইবরাহিম যখন বললেন, আমার পালনকর্তা হলেন তিনি, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমিও জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটিয়ে থাকি। ইবরাহিম বলল, নিশ্চয়ই তিনি সূর্যকে উদিত করেন পূর্ব দিক থেকে, এবার তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো। তখন সে কাফির হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে সরলপথ প্রদর্শন করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৫৮)

নিজেকে প্রভু দাবি করার মতো ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারী শাসক ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘ফেরাউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করতে লাগল এবং তারা মনে করল যে তারা আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে না। অতঃপর আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম, তারপর তাদের সাগরে নিক্ষেপ করলাম। অতএব দেখো, জালেমদের পরিণাম কী হয়েছে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৩৯-৪০)

আল্লাহ একমাত্র রাজাধিরাজ। তার শক্তি ও ক্ষমতার সামনে দুনিয়ার কোনো পরাশক্তি ও শাসনক্ষমতা টিকে থাকার সাহস করতে পারে না। তবে সাময়িক সময়ের জন্য আল্লাহ বান্দাকে সুযোগ দেন—‘নিজেকে শুধরে নেওয়ার’; কিন্তু তিনি ছেড়ে দেন না। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, হে আল্লাহ, তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করো, আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত করো। তোমারই হাতে আছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ২৬)

দুনিয়া মানুষের পরীক্ষাগার। এখানে প্রতিটি মুহূর্তে তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। কাউকে নিঃস্ব ও অসহায় করে আবার কাউকে শাসনক্ষমতা ও অর্থ-সম্পদ দিয়ে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। সর্বাবস্থায় মানুষের উচিত আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। অহংকার ও দাম্ভিকতা পরিহার করে চলা। একনিষ্ঠচিত্তে তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য করে যাওয়া। বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। অতএব, তাকে ডাকো তাঁর খাঁটি ইবাদতের মাধ্যমে। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর।’ (সুরা আল-মুমিন, আয়াত : ৬৫)

লেখক : খতিব, শেখ হাসিনা পদ্মপুকুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ মহেশপুর, ঝিনাইদহ

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন