হোম আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় রক্ত জমাট বাঁধার প্রমাণ

অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় রক্ত জমাট বাঁধার প্রমাণ

কর্তৃক স্টাফ রিপোর্টার
22 ভিউস

গবেষণার পেছনের দলটি বলছে, তারা বিশ্বাস করে যে অক্সফোর্ড- অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনে ব্যবহৃত শিম্পাঞ্জি থেকে প্রাপ্ত ভাইরাসটির একটি নির্দিষ্ট মিথস্ক্রিয়া রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিজের বিরুদ্ধে কাজ করতে প্ররোচিত করতে পারে। যদিও এ ধরনের ঘটনা খুব কমসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের পর অনেক দেশেই করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। শরীরে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অ্যাস্ট্রাজেনেকার কার্যকারিতা গবেষণায় প্রমাণিত। তবে এ টিকা মানবদেহে প্রয়োগের ফলে রক্ত জমাট বাঁধার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়ে রক্ত জমাট বাঁধার কারণ খুঁজে পেয়েছেন।

যেসব ভাইরাসের কারণে স্তন্যপায়ীদের ঠান্ডা-কাশি দেখা দেয়, সে রকম এডিনোভাইরাসের সঙ্গে করোনার জিনগত উপাদান মিশিয়ে এ টিকা তৈরি হয়। মাংসপেশিতে টিকা প্রয়োগের ফলে অনেক সময় রক্ত প্রবাহের সঙ্গে মিশে যায়।

ফলে এর উপাদান রক্তের প্রোটিন কনা প্লাটিলেট ফ্যাক্টর-৪-কে আকর্ষণ করে। তখন অ্যান্টিবডি ও প্লাটিলেট ফ্যাক্টর-৪ মিলিত হওয়ার কারণে রক্ত জমাট বাঁধার মতো ঘটনা ঘটে থাকে।

এডিনোভাইরাস এক ধরনের ভাইরাল ভ্যাক্টর। সাধারণত আণবিক জীববিজ্ঞানীরা কোষগুলোতে জিনগত উপাদান সরবরাহ করতে এটি ব্যবহার করেন। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় পাওয়া এডিনোভাইরাসটি শিম্পাঞ্জির মধ্যে দেখা যায়।

গবেষণার পেছনের দলটি বলছে, তারা বিশ্বাস করে যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনে ব্যবহৃত শিম্পাঞ্জি থেকে প্রাপ্ত ভাইরাসটির একটি নির্দিষ্ট মিথস্ক্রিয়া রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিজের বিরুদ্ধে কাজ করতে প্ররোচিত করতে পারে। যদিও এ ধরনের ঘটনা খুব কমসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে।

কার্ডিফের গবেষকদের সঙ্গে অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিজ্ঞানীরাও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, টিকা নিয়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনার চেয়ে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বেশি।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেয়ার পর অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি ও কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা তাদের গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশ করেন। যদিও গবেষণার সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানীরা জোর দিয়েছিলেন যে, ঘটনাটি খুব কমসংখ্যক মানুষে মধ্যে ঘটে।

জনসন অ্যান্ড জনসনের কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনটিও করোনাভাইরাস থেকে মানব কোষে স্পাইক প্রোটিন বহন করার জন্য এডিনোভাইরাস ব্যবহার করে থাকে। ফলে জনসনের টিকাতেও বিরল রক্ত জমাট বাঁধার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

সিএনবিসির প্রতিবেদনের বরাতে, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা শরীরে ঝুঁকির চেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই বেশি তৈরি করে।

 

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা টিকা নেওয়ার ফলে মানবদেহে রক্ত জমাট বাঁধার কোনও প্রমাণ মেলেনি। ভ্যাকসিনগ্রহীতাদের ওপর পর্যালোচনার ভিত্তিতে রবিবার এমন দাবি করেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঘটনায় বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিনটির প্রয়োগ স্থগিতের পর টিকাগ্রহীতাদের ওপর পর্যালোচনা চালায় অ্যাস্ট্রাজেনেকা।

কোম্পানিটি জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে এক কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে সতর্ক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা বা অন্য কোনও ঝুঁকির মুখে তারা পড়েননি। বয়স, লিঙ্গ বা টিকার ব্যাচের ভিত্তিতে কিংবা নির্দিষ্ট কোনও দেশেও ভ্যাকসিন গ্রহণের ফলে এ ধরনের কোনও ঝুঁকি তৈরি হওয়ার প্রমাণ মেলেনি।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার চিফ মেডিকেল অফিসার আন টেলর বলেছেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ আমাদের ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা কয়েকশ-এরও কম। ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এই ভ্যাকসিন ব্যবহারের ফলেই শরীরে রক্ত জমাট বাঁধছে; এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদের উদ্ভাবিত এই ভ্যাকসিনটি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হয়েছে।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

অ্যাস্ট্রাজেনেকা কিংবা ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সির পক্ষ থেকে একাধিক বার আশ্বস্ত করা হলেও এই টিকার গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। এরইমধ্যে অন্তত অর্ধ ডজন ইউরোপীয় দেশ থেকে ভ্যাকসিনটি বর্জনের ঘোষণা এসেছে। গত কয়েক দিনে এই টিকার প্রয়োগ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ডেনমার্ক, নরওয়ে, বুলগেরিয়া, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও থাইল্যান্ড। সর্বশেষ রবিবার এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে নেদারল্যান্ডস। ডাচ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে আগামী ২৯ মার্চ পর্যন্ত ভ্যাকসিনটির প্রয়োগ স্থগিত রাখবে আমস্টারডাম।

এক বিবৃতিতে ডাচ সরকার জানিয়েছে, ডেনমার্ক ও নরওয়ে থেকে সম্ভাব্য গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর প্রকাশের পর তারা সাবধানতা অবলম্বন করছে। ডাচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুগো ডি জনগি বলেছেন, তার দেশ এই ভ্যাকসিন নিয়ে কোনও সন্দেহ তৈরির সুযোগ দিতে পারে না। তার ভাষায়, ‘আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, সবকিছু ঠিক আছে। তাই আপাতত বিরতি দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।’

বিবিসি জানিয়েছে, রবিবারের এই সিদ্ধান্তের ফলে নেদারল্যান্ডসের টিকাদান কর্মসূচিও পিছিয়ে পড়বে। অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই কোটি ২০ লাখ ডোজ টিকা প্রি-অর্ডার করেছিল দেশটি। এরমধ্যে আগামী দুই সপ্তাহে প্রায় তিন লাখ ডোজ ভ্যাকসিন নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর কথা ছিল।

এর আগে শনিবার নরওয়ের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নেওয়া তিন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা গেছে। তাদের এখন রক্তপাত, রক্ত জমাট বাঁধা এবং রক্তের প্লেটলেটের স্বল্প সংখ্যার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নরওয়ে ছাড়াও ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও এই ভ্যাকসিন নেওয়ার পর কারও কারও শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার বিচ্ছিন্ন খবর পাওয়া গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিন দেশই অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ব্যবহার স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। পরে এই তালিকায় যুক্ত হয় আরও একাধিক দেশ।

লোকজনের রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছে নরওয়েজিয়ান মেডিসিন এজেন্সি। নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের সঙ্গে যৌথভাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এজেন্সির সিনিয়র চিকিৎসক সিগার্ড হর্টেমো বলেন, এই ঘটনাগুলো ভ্যাকসিনের সঙ্গে যুক্ত কিনা সেটি আমাদের জানা নেই। রয়টার্স জানিয়েছে, নরওয়েতে এমন উপসর্গ দেখা দেওয়া তিন স্বাস্থ্যকর্মীর সবার বয়স ৫০ বছরের মধ্যে। সিগার্ড হর্টেমো জানিয়েছেন, ইউরোপের মেডিসিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (ইএমএ) এই তিনজনের ঘটনা নিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করবে।

সম্প্রতি অস্ট্রিয়াতেও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের একটি ব্যাচ প্রয়োগ বাতিলের ঘোষণা আসে। দেশটিতে ভ্যাকসিন নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় এক নারীর মৃত্যুর পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অস্ট্রিয়ার এই ব্যাচটি ইউরোপের ১৭টি দেশে পাঠানো এবিভি৫৩০০ নামের ব্যাচের ১০ লাখ ডোজের অংশ। এস্টোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও লুক্সেমবার্গও ওই ব্যাচটির প্রয়োগ বাতিল করেছে। তবে অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলছে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটির সুরক্ষার বিষয়টি গভীরভাবে গবেষণা করা হয়েছে। কোম্পানির একজন মুখপাত্র বলেন, রোগীর সুরক্ষাকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেয়। ওষুধ নিয়ন্ত্রকরা ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা মান মেনেই ভ্যাকসিনকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পিয়ার রিভিউ করা তথ্যেও দেখা গেছে সাধারণভাবে শরীরের জন্য ভালো সহিষ্ণু।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।

০ মন্তব্য
0

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন